বিশেষ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জের হাওরে ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবেও অনেকের ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাওর-ভাটির কৃষক। ধানের দাম পড়তি থাকলেও বাজার থেকে অতিরিক্ত মূল্যে চাল চান কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ধান কেনা ও চাল বিক্রিতে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা সুনামগঞ্জে ধান চালের দামে এই বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সুধীজন। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। তবে আগাম বন্যা ও বৃষ্টির কারণে কাটা ও স্তূপ করা ধান কালচে হয়ে গুণাগুণ নষ্ট হয়েছে এমন অভিযোগে ব্যবসায়ীরা কম টাকায় ধান কিনে নিচ্ছেন বলে জানান কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি বোরো মওসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। বেসরকারি হিসেবে আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতায় হাওরের প্রায় ৪০ ভাগ জমির ধানের ক্ষতি হলেও বাকি অবশিষ্ট ফসল চরম দুর্ভোগ সইয়ে সংগ্রহ করেছেন কৃষক। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৭০ হাজার কৃষককে সরকার তিন মাসের জন্য ৩ হাজার টাকা করে ও ৩০ কেজি করে চাল প্রণোদনা দিয়েছে। সরকারি হিসেবে মোট ১৫ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি বলে জানান কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তাছাড়া সরকার কৃষক পর্যায় থেকে ধান সংগ্রহ অভিযানের যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল তা উৎপাদনের তুলনায় অপ্রতুল ও সংগ্রহ কার্যক্রম নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও দুর্ভোগের থাকায় বেশিরভাগ কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন নি - এমন অভিযোগ আছে। যার ফলে তাদের ধান বাড়িতে রয়ে গেছে। সরকার চলতি মওসুমে ২১ হাজার ৩৪৯ মে.টন ধান সুনামগঞ্জ থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। প্রায় ২০ হাজার মে.টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে অনেক কৃষকের ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তাছাড়া নানা কারণে ৬০০-৮০০ টাকা মণ দরে বাধ্য হয়ে ধান বিক্রি করছেন কৃষকরা। অথচ সরকারি হিসেবে ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুরোনো ও নতুন সরু চাল মণপ্রতি ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ভালো উৎপাদনের পরেও হাওরের বাজারগুলোতে চালের দামে কোনও প্রভাব পড়েনি বলে জানান ভুক্তভোগীরা। কিন্তু ধানের বাজারে বিরাট প্রভাব পড়েছে। ধানের দাম বাড়ছেই না। কালিপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক বদিউজ্জামানকে গত ২৭ আগস্ট দেখা গেলো তিনটি অটোগাড়িতে ধানের বস্তা নিয়ে একটি অটোমিলের উদ্দেশ্যে ছুটে আসতে। তিনি জানান, বেশি দামে বিক্রি করার আশায় খেতের ধান সংরক্ষণ করেছিলেন। এখন ধানের দাম পড়তির দিকে। সংরক্ষণের অভাবে ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হওয়ায় তিনি ৬৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে তার উৎপাদনমূল্যই ওঠছেনা বলে জানান। তিনি জানান, প্রতি ৩০ শতাংশ জমিতে ৮-৯ হাজার টাকা খরচ হয়। ধান উৎপাদন হয় ১০-১২ মণ। কৃষক কোনও রকম পুষিয়ে নিতে পারেন ন্যায্য মূল্য পেলে। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বড়ো কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, আমি প্রায় হাজার মণ ধান পেয়েছি। সরকারি গুদামে ধান দিতে পারিনি। এখন ধান বিক্রিও করতে পারছিনা। পাইকাররা ৬০০-৮০০ টাকার বেশি দাম দিতে চাচ্ছে না। এই অবস্থায় আমার এলাকার শত শত কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য মোনাজ্জির হোসেন সুজন বলেন, সুনামগঞ্জের কৃষক হাওরের ধানের উপরই নির্ভরশীল। তারা ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে নানা সংকট মোকাবেলা করেন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কৃষকদের স্বার্থ সবার আগে দেখা উচিত। সুনামগঞ্জে ধান চালের বাজারে কোনও সিন্ডিকেট থাকলে তা ভেঙে দিয়ে কৃষকদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিতে হবে। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায় থেকে কৃষকদের ধান সংগ্রহ করা হবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত কৃষকদের বঞ্চনা দূর হবেনা। এবার কৃষকরা ধান বিক্রি করছে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কমে। অথচ উৎপাদন অনুপাতে চালের বাজারে কোনও প্রভাব পড়েনি। চালের দাম কমেনি। কিন্তু পাইকাররা ধান কালচে হয়ে গুণাগুণ নষ্ট হয়েছে এমন অভিযোগ এনে কম দামে ধান কিনছেন বলে জানান তিনি। সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফেরদৌস জাহান নিশাত বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাইনা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সাথে কথা বলতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
বিরাট ক্ষতির মুখে কৃষক
হাওরে ধানের বাজার মন্দা, চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী
- আপলোড সময় : ০৩-০৯-২০২৬ ০৮:৩২:৪২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-০৯-২০২৬ ০৮:৩৩:৪৫ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি